আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): ওমানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষোভ প্রকাশ এবং দেশটিকে 'উড়িয়ে দেওয়া'র হুমকি স্পষ্ট করেছে যে, এই অঞ্চলের সমীকরণ ব্যাপকভাবে বদলে গেছে।
আমেরিকা আর একক পরাশক্তি নয়—বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে এখন আর তাদের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা আর নেই।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে টোল আদায়ের বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। এমন খবর প্রকাশের পরই মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ওমান ‘ঠিকভাবে আচরণ না করলে’ দেশটিকে ‘উড়িয়ে দিতে’ হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওমানকে দেওয়া আমেরিকার এই তীব্র হুমকি কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বার্তা বহন করে। এতে বোঝা যায়, পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আধিপত্য কতটা হারিয়েছে। তারা এখন এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে বোমাবর্ষণের হুমকি দিচ্ছে, যারা আসলে তাদেরই মিত্র। আর এটি করা হচ্ছে ইরানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে, যা ইরান যুদ্ধকালীন সময় গড়ে তুলেছে।
সম্প্রতি আরব দেশগুলোর ওপর আমেরিকার নানা ধরণের রাজনৈতিক চাপ ও হুমকি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আরব দেশগুলোর ওপর মার্কিন চাপ তারই একটি উদাহরণ।
পারস্য উপসাগরে ইরানের সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অংশ হিসেবে, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন কৌশল নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের উপ-সচিব আলি বাকেরি কানি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি নতুন কৌশল নিয়ে ইরান ও ওমান যৌথ আলোচনা চালাচ্ছে। এই আলোচনার পরপরই ওমানের বিরুদ্ধে আমেরিকার হুমকি শুরু হয় এবং তা তীব্র আকার ধারণ করে।
বর্তমানে এই অঞ্চলে একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে; যেখানে ইরান একই সাথে তার সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। মূলত এই গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন—যা আমেরিকাকে বাদ দিয়ে এবং তাদের ইচ্ছা ও স্বার্থকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ঘটছে—আর তাতেই ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি এখন আর কেবল জ্বালানি পরিবহনের পথ নয়; এটি এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রতিযোগিতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইরান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। আজ হরমুজ প্রণালিতে যা ঘটছে, তা কেবল জাহাজ চলাচল বা সামুদ্রিক নিয়মকানুন নিয়ে কোনো সাধারণ বিরোধ নয়; বরং এটি এই অঞ্চলে ক্ষমতার এক নতুন বিন্যাস এবং এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ে প্রবেশের স্পষ্ট লক্ষণ।
আমেরিকা, যারা বছরের পর বছর ধরে নিজেকে পারস্য উপসাগরের অবিসংবাদিত শক্তি মনে করত, তারা এখন এমন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি—যা আর কেবল পূর্বের কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
ওমানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এই ক্ষোভ এবং কড়া ভাষা মূলত ওয়াশিংটনের সেই গভীর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ। কারণ, আমেরিকাকে ছাড়াই—বিশেষ করে ইরানের নেতৃত্বে এই অঞ্চলে এখন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে।
এমন পরিস্থিতিতে, সামরিক হুমকি এবং অর্থনৈতিক চাপ কোনো শক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তা আন্তর্জাতিক মহলে আমেরিকার প্রভাব খর্ব হওয়া এবং তার একক আধিপত্যের পতনেরই ইঙ্গিত। হরমুজ প্রণালি আজ শুধু একটি জ্বালানি করিডোর নয়, বরং এটি এমন এক মঞ্চে পরিণত হয়েছে যেখানে পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার ভবিষ্যৎ ভারসাম্য নির্ধারিত হচ্ছে; এবং এই মঞ্চে অতীতের মতো আমেরিকা আর একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পক্ষ হিসেবে টিকে থাকতে পারছে না।
Your Comment