আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): সর্বোচ্চ নেতা সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী বিশেষ এই বাণীতে তিনি পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের বৈধ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা জারি সংক্রান্ত নতুন বিধান প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।
بسمالله الرّحمن الرّحیم
আমাদের অঞ্চলের মুসলিম জাতিগুলোর জন্য, বিশেষ করে ইসলামী ইরানের মহান জাতির জন্য, সর্বশক্তিমান আল্লাহর অন্যতম অতুলনীয় অনুগ্রহ হল "পারস্য উপসাগর"। এটি শুধু পানির ধারা নয়, তার চেয়েও বড় এক অনুগ্রহ, আমাদের জাতীয় পরিচিতি ও সভ্যতার একটি অংশ গড়ে উঠেছে এই উপসাগরকে ঘিরে এবং জাতিগুলোর সংযোগস্থল হওয়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী ও এর পরবর্তী ওমান সাগরে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য পথ তৈরি করেছে।
এই কৌশলগত সম্পদ বিগত শতাব্দিগুলোতে বহু শয়তান বৈশিষ্ট ব্যক্তি লোভ জাগিয়ে তুলেছে এবং ইউরোপীয় ও মার্কিন বিজাতীয়দের বারবার আগ্রাসনের ইতিহাস, নিরাপত্তাহীনতা, ক্ষয়ক্ষতি, এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতি অজস্র হুমকি হল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে বিশ্বের দাম্ভিক শক্তিগুলোর অশুভ পরিকল্পনার এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র যার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হল ‘মহা শয়তান’-এর (আমেরিকার) সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী খঞ্জর-চালনা তথা হত্যাযজ্ঞ।
পারস্য উপসাগরে বৃহত্তম উপকূলরেখার অধিকারী ইরানি জাতি, পারস্য উপসাগরের স্বাধীনতার জন্য এবং বিদেশী ও আগ্রাসীদের মোকাবেলায় সবচেয়ে বেশি প্রাণান্তকর ত্যাগ স্বীকার করেছে; পর্তুগিজদের বিতাড়ন এবং হরমুজ প্রণালিকে মুক্ত করা যার ভিত্তিতে ফার্সি ১০ই উর্দিবেহেশত তারিখ (৩০ মে)কে জাতীয় পারস্য-উপসাগর দিবস নামকরণ করা হয়েছে, সেসব থেকে শুরু করে ডাচ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গৌরবময় কীর্তি-গাঁথাগুলো গড়া পর্যন্ত এবং... অবশেষে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দাম্ভিক শক্তিগুলোর হাত কেটে ফেলার ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধগুলোর মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ইসলামী বিপ্লব।
আজ, এই অঞ্চলে বিশ্বের পরাক্রমশালী শক্তিগুলোর বৃহত্তম অভিযান ও আগ্রাসন এবং আমেরিকার ষড়যন্ত্রের লজ্জাজনক ব্যর্থতার দুই মাস পর, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে।
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো, যারা বহু বছর ধরে দুর্বৃত্ত ও আগ্রাসনকারীদের সামনে তাদের শাসকদের নীরবতা ও অপমান সহ্য করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল, তারা গত ষাট দিনে নিজ চোখে দেখেছে বিদেশি আধিপত্য প্রত্যাখ্যানের লড়াইয়ে সশস্ত্র বাহিনীর নৌ-শাখা ও ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি-র দৃঢ়তা, সতর্কতা ও সাহসী সংগ্রামের সুন্দর বহিঃপ্রকাশ এবং এর পাশাপাশি ইরানের প্রিয় দক্ষিণাঞ্চলের জনগণ ও যুব-সমাজের উদ্যম ও বীরত্ব।
ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সর্বশেষ যুদ্ধের পর, “শুধু বিশ্ব জনমত ও এই অঞ্চলের দেশগুলোর কাছেই নয়, এমনকি বিভিন্ন দেশের শাসকদের কাছেও এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ভূখণ্ডে আমেরিকান বিদেশিদের উপস্থিতি এবং তাদের আস্তানা গাড়া ও ঘাঁটি স্থাপনই এই অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।”
এবং আমেরিকার কাগুজে বা অতি-ভঙ্গুর ঘাঁটিগুলো যখন নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো শক্তি বা সামর্থ্যই রাখে না তখন সেখানে আমেরিকা যে তার নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী এবং এই অঞ্চলের আমেরিকা-পূজারিদের নিরাপত্তা দেবে, এমন কোনও আশাই নেই।
আল্লাহর রহমতে ও শক্তিতে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ হবে আমেরিকা-বিহীন এক ভবিষ্যৎ, যা হবে এর জনগণের অগ্রগতি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সমৃদ্ধির সেবায় নিবেদিত। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের পানিতে আমাদের প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের ভাগ্য একই, এবং হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে যারা লোভের বশে সেখানে অপকর্ম করে, সেই বিদেশীদের জন্য এই সাগরের গভীরতম অংশ (তথা তলায় ডুবে যাওয়া ছাড়া) আর কোনও স্থান নেই।
আর সর্বশক্তিমান আল্লাহর কৃপায়, প্রতিরোধের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নীতি এবং শক্তিশালী ইরানের কৌশলের ছায়ায় অর্জিত এই বিজয়ের ধারা এ অঞ্চলে ও বিশ্বে এক নতুন ব্যবস্থার সূচনা করবে।
আজ ইরানি জাতির এই অলৌকিক জাগরণ শুধু ইহুদিবাদ ও রক্তপিপাসু আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য জান-কুরবান করতে প্রতিজ্ঞ কোটি কোটি জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জেগে-ওঠা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ সারির সামনের পর্যায়ে, দেশের ভেতরে ও বাইরে থাকা নব্বই মিলিয়ন তথা নয় কোটি উদ্যমী ও মহৎ ইরানি দেশবাসী তাদের গৌরবময় জাতীয় পরিচিতির সব শাখা, আধ্যাত্মিক, মানবিক, বিজ্ঞান, শিল্প এবং ন্যানো ও জৈব ক্ষেত্র থেকে শুরু করে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পর্যন্ত মৌলিক ও নতুন প্রযুক্তির সমস্ত সক্ষমতাকে তাদের জাতীয় পুঁজি বলে মনে করছেন এবং পানি, স্থল ও আকাশসীমার মতো সেগুলোকে রক্ষা করবেন।
“হরমুজ প্রণালীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনের অনুগ্রহ বা নেয়ামতের প্রতি বাস্তব কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে ইসলামী ইরান পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলকে সুরক্ষিত করবে এবং এই পানিপথের শত্রুভাবাপন্ন শক্তির অপব্যবহারের বেসাতিগুলো নির্মূল করবে।''
এই জলপথটি নতুন নিয়মকানুনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে বলে জানিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, “হরমুজ প্রণালীর আইনি নিয়মকানুন এবং নতুন ব্যবস্থাপনার প্রয়োগ এই অঞ্চলের সকল জাতির জন্য শান্তি-স্বস্তি ও অগ্রগতি বয়ে আনবে এবং এর অর্থনৈতিক নেয়ামত জাতির হৃদয়কে আনন্দিত করবে; মহান আল্লাহর ইচ্ছায়, যদিও অবিশ্বাসী বা কাফিরদের জন্য তা পছন্দের নয়। ”
সাইয়্যেদ মুজতাবা হোসেইনি খামেনেয়ী
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ (ফার্সি ১০ উর্দিবেহেশত, ১৪০৫)
Your Comment