২৩ মে ২০২৬ - ১৪:১৯
মসজিদকে সবসময়ই নিরাপদ জায়গা মনে করতাম

সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে হওয়া প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় শোকাহত মুসলিম সম্প্রদায় মেয়র টড গ্লোরিয়া এবং শহরের অন্যান্য নেতাদের প্রতি তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): সান ডিয়েগোর ইসলামিক সেন্টারে হওয়া প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় গভীরভাবে শোকাহত, আর স্থানীয় বাসিন্দারা সিটি নেতাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন—তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধির সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে।

 দুপুরের নামাজের কিছু আগে মসজিদের বাইরে দুই বন্দুকধারী গুলি চালায়। এতে ৫১ বছর বয়সী আমিন আবদুল্লাহ, ৫৭ বছর বয়সী নাদির আওয়াদ এবং ৭৮ বছর বয়সী মানসুর কাজিহা যাকে কমিউনিটিতে আদর করে ‘আবু এজ’ নামে ডাকা হতো নিহত হন।

পুলিশ ও এফবিআই ঘটনাটিকে ঘৃণামূলক অপরাধ হিসেবে তদন্ত করছে, কারণ হামলাকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত উগ্রপন্থী লেখা পাওয়া গেছে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুজন হামলাকারী নব্য-নাৎসি প্রচারণা এবং পূর্বের মুসলিমবিরোধী হামলা—বিশেষ করে ২০১৯ সালের নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ মসজিদ হামলা—থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকতে পারে।

সান ডিয়েগোর মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকের জন্য এই হামলা যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধির আশঙ্কা আরও গভীর করেছে।

সান ডিয়েগোর আইনজীবী ও দীর্ঘদিনের মসজিদ-সদস্য ওসামা শাবাইক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আমি সঙ্গে সঙ্গে ভেবেছিলাম, এটা আরেকটা ঘটনা—কেউ বুঝি ‘বিবি’ গান ব্যবহার করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে অনেকবার এমন হয়েছে—কেউ মসজিদের পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে BB গান ছুঁড়েছে, মসজিদে কিছু নিক্ষেপ করেছে—এমন অনেক ঘটনা। তারপর আমার স্ত্রী ফোন করে বলল, ‘তুমি খবর দেখেছ? আমিন মারা গেছে -আমি একেবারে থমকে গিয়েছিলাম।’

ইসলামিক সেন্টার অব সান ডিয়েগো, যা কাউন্টির বৃহত্তম মসজিদ, সেখানে প্রায় ১৪০ শিশু একটি স্কুলে পড়ে।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে কাজ করা আবদুল্লাহর দ্রুত পদক্ষেপের কারণে লকডাউন শুরু হয়, যা আরও বড় প্রাণহানি ঠেকাতে সাহায্য করে।

ক্যালিফোর্নিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুই হাজারের বেশি মানুষ বৃহস্পতিবার জানাজায় অংশ নেন, যেখানে নিহতদের মুসল্লি ও শিশুদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দেওয়া ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে স্মরণ করা হয়।

এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন অধিকার সংগঠনগুলো বলছে—গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাজনিত ঘটনাগুলো দ্রুত বেড়েছে।

কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ৮,৬৫৮টি ইসলামোফোবিয়া ও আরব-বিরোধী বৈষম্যের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

সান ডিয়েগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী সামার ইসমাইল বলেন, মুসলিম সংগঠকরা বহুবার কর্তৃপক্ষকে বাড়তে থাকা শত্রুতার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।

তিনি বলেন,‘গত তিন বছর ধরে, ফিলিস্তিনে গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে… আমরা বিশ্ববিদ্যালয়, নির্বাচিত কর্মকর্তা, স্কুল—সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে আরব-বিরোধী ও ফিলিস্তিন-বিরোধী ইসলামোফোবিয়া কতটা গুরুতর হয়ে উঠেছে।’

অনেক বাসিন্দা সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ইসরায়েলের একজন দৃঢ় সমর্থক হিসেবে পরিচিত এবং প্রো-ফিলিস্তিন বিক্ষোভকারীদের সমালোচনা করেছেন।

একজন স্থানীয় বাসিন্দা সোমবার মসজিদে গিয়ে গ্লোরিয়াকে উদ্দেশ করে চিৎকার করে বলেন,‘তুমি জায়নিস্ট প্রচারণাকে উসকে দিয়েছ, আর যতদিন এটা তোমার পকেট ভরছে ততদিন তুমি এটা চালিয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মুসলিম ভাই-বোনেরা কতদিন ধরে তোমাদের বলছে?’

কিছু কমিউনিটি সদস্য অভিযোগ করেন, আগের সতর্কবার্তা ও হুমকির বিষয়ে মেয়র যথাযথভাবে সাড়া দেননি।

ইসমাইল বলেন, ‘১০ অক্টোবর ৭-এর পর থেকে তিনি শেষ মুহূর্তে আমাদের মিটিং বাতিল করেন… আর তারপর হামলার দিন এসে হাজির হন।’

শাবাইকও সমালোচনা করে বলেন, ‘মেয়র গ্লোরিয়া এমন কেউ নন যাকে আমি আমাদের মুসলিম স্পেসে স্বাগত জানাব। তিনি বহু বছর আগে থেকেই মুসলিম কমিউনিটির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। নিরাপত্তার ভ্রান্ত অনুভূতি ভেঙে গেছে।’

শাবাইক আরও প্রশ্ন তোলেন, হামলার আগে কর্তৃপক্ষ কোনো সতর্ক সংকেত মিস করেছে কি না।

তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কিছু গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।’

তিনি জানান, প্রথম গুলির কয়েক ঘণ্টা আগে একজন সন্দেহভাজনের মা পুলিশকে ফোন করে জানান যে তার ছেলে আত্মহত্যাপ্রবণ এবং তার কাছে অস্ত্র রয়েছে।

শাবাইক আরও বলেন, হামলাকারী কেইন ক্লার্ক অনলাইনে হামলার ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করছিলেন এবং সেটি সম্পর্কে কমিউনিটি জানত।

তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে এক ব্যক্তি এফবিআইকে কেইন ক্লার্ক সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। সে ডিসকর্ড অ্যাপে একই ধরনের বন্দুক ও বুলেটপ্রুফ ভেস্টের ছবি পোস্ট করছিল, যেগুলো পরে হামলায় ব্যবহৃত হয়। 

কর্তৃপক্ষ এখনো নিশ্চিত করেনি যে ফেডারেল সংস্থাগুলো আগে এসব অনলাইন কার্যকলাপ সম্পর্কে জানত কি না। অনেক উপাসকের জন্য এই হামলা মসজিদের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে দিয়েছে।

শাবাইক বলেন, আমি ৯/১১-এর সময় অষ্টম শ্রেণিতে ছিলাম। আমরা সবসময় জানতাম আমাদের পিঠে লক্ষ্য আছে, কিন্তু মসজিদটা ছিল নিরাপদ জায়গা। 

ইসমাইল বলেন, মসজিদটি ছিল তার ‘দ্বিতীয় বাড়ি’, কিন্তু এখন সেই নিরাপত্তার অনুভূতি ভেঙে গেছে।

তিনি বলেন, ‘এটা ছিল আমার দেখা সবচেয়ে ভিন্ন ধরনের মসজিদ। এটা ছিল আমার জন্য নিজের বাড়ির বাইরে একটা পরিবার খুঁজে পাওয়ার জায়গা… কিন্তু এখন সেই কমিউনিটিতে ভয় আরও বেড়ে গেছে।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha