২৬ এপ্রিল ২০২৬ - ২৩:৩০
ইরান যুদ্ধে ১২০০ প্যাট্রিয়ট ১০০০ টমাহক হারিয়ে সংকটে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন তাদের নিজস্ব মজুত নিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

আহলে বাইত (আ.) বার্তা সংস্থা (আবনা): সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মাত্র ৩৮ দিনের এই সংঘাত মার্কিন প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে পেন্টাগন এমন সব দামী এবং উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যা মূলত রাশিয়া বা চীনের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, এই যুদ্ধে মার্কিন সেনারা ১২শ'টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১ হাজারটিরও বেশি টমাহক ক্রুজ মিসাইল খরচ করেছে। বিপুল এই ক্ষয়ক্ষতির ফলে আমেরিকার নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার এখন কার্যত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত এক বছরে দেশটি যতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছিল, এই কদিনেই তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ব্যবহৃত হয়ে গেছে।

হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৫.৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের গোলাবারুদ ও মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যুদ্ধ আমেরিকার সামগ্রিক সামরিক বাজেটের ওপর বড় ধরনের আঘাত। গত ৩৮ দিনের যুদ্ধে আমেরিকার মোট খরচের পরিমাণ ২৮ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে হতে পারে বলে স্বাধীন গবেষণা সংস্থাগুলো ধারণা করছে, যার অর্থ প্রতিদিন গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জেএএসএসএম-ইআর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে। আমেরিকার কাছে থাকা মোট ১৫শ'টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১১শ'টিই এই যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে। ৬০০ মাইলের বেশি পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শত্রুঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করতে সক্ষম। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ১১ লক্ষ ডলার, যা মার্কিন করদাতাদের পকেটে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার কথা স্বীকার করলেও প্রকৃত চিত্রটি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, একটি বড় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে অনেক সময় যুদ্ধবিমান বা কামান থেকে একাধিকবার আক্রমণ চালাতে হয়। ফলে ব্যবহৃত বোমা ও মিসাইলের প্রকৃত সংখ্যা সরকারি তথ্যের চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে ইউরোপ এবং এশিয়ায় মোতায়েন করা মার্কিন কমান্ডগুলো থেকেও অস্ত্র সরিয়ে ইরানে আনা হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ভারসাম্যকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র সেবা কমিটির প্রধান জ্যাক রিড এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, বর্তমানে যে হারে অস্ত্র উৎপাদন হচ্ছে, তাতে এই ঘাটতি পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পেন্টাগন এখন কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত তহবিলের জন্য হাত পেতেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প আদৌ এতো দ্রুত গতিতে এই বিপুল পরিমাণ উচ্চমূল্যের অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এই যুদ্ধ পেন্টাগনের একটি বড় দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সস্তা ড্রোন বা সাধারণ আক্রমণের মুখে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য মোটেও কার্যকর নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশেষজ্ঞ মার্ক এফ ক্যানসিয়ান সতর্ক করেছেন, যুদ্ধের আগেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কম ছিল, যা এখন বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে হোয়াইট হাউস অবশ্য এই সংকট বা ক্ষয়ক্ষতির খবরকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির অধিকারী এবং তাদের কাছে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো যথেষ্ট অস্ত্র মজুত আছে। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা যেকোনো সামরিক অভিযান সফল করতে মার্কিন বাহিনী এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত।

Tags

Your Comment

You are replying to: .
captcha